আজকের খবর

শীত এলেই হাওর-বাঁওড়ে অতিথি পাখির মেলা

রানা খান, স্টাফ রিপোর্টার নেত্রকোনা। ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ১১:৩৫ পূর্বাহ্ন
news image

বাংলাদেশে শীতের আগমন মানেই প্রকৃতির ভিন্ন এক রূপ। বিশেষ করে দেশের হাওর-বাঁওড়, নদী-নালা ও জলাশয়ে দেখা মেলে হাজারো অতিথি পাখির সমাবেশ। বরফশীতল উত্তর দিকের দেশগুলো থেকে উষ্ণতা, খাবার এবং নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে প্রতিবছর শীত মৌসুমেই তারা আসে বাংলাদেশে। আর তাদের আগমনে প্রাণ ফিরে পায় জলজ পরিবেশ, উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠে স্থানীয় পর্যটন।

নেত্রকোনার মদন-আটপাড়া খালিয়াজুরী, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, কিশোরগঞ্জের ইটনা-মিঠামইনসহ দেশের বিভিন্ন হাওর এলাকায় এখন অতিথি পাখির কোলাহল। ভোরের আলো ফুটতেই আকাশজুড়ে সারি বেঁধে উড়ে বেড়ায় বড় গাঙচিল, চখাচখি, পাতি রাজহাঁস, গুটিহাঁস, ফিঙ্গে হাঁস, জলকোকিলসহ নানা প্রজাতির পাখি। কোথাও পানির ওপর ভেসে বিশ্রাম, কোথাও মাছ ও শ্যাওলা খোঁজার তৎপরতা—দৃশ্যগুলো যেন এক চলমান চিত্রকর্ম।

প্রকৃতি বিশেষজ্ঞরা জানান, শীতের সময় প্রায় ২৫০–৩০০ প্রজাতির অতিথি পাখি বাংলাদেশে আসে। এরা মূলত সাইবেরিয়া, ইউরোপ, চীন ও মঙ্গোলিয়া অঞ্চলের কঠিন শীত থেকে বাঁচতে তুলনামূলক উষ্ণ দেশের সন্ধানে দক্ষিণে যাত্রা করে। বাংলাদেশ তাদের জন্য নিরাপদ ও খাদ্যসমৃদ্ধ আবাস হিসেবে পরিচিত।

তবে অতিথি পাখির সংখ্যা আগের মতো নেই বলে জানিয়েছেন পরিবেশকর্মীরা। শিকার, বিষ দিয়ে মারার ঘটনা, জলাশয় ভরাট, প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হওয়া—এসব কারণে তাদের সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে কিছু অসাধু শিকারির সক্রিয়তা পরিবেশের জন্য বড় হুমকি।

স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো হলে অতিথি পাখির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে শিকার রোধ করা গেলে পাখিদের জন্য শীতকালীন আশ্রয়স্থল আরও নিরাপদ হবে।

অতিথি পাখির উপস্থিতি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই বাড়ায় না, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জলজ প্রাণী নিয়ন্ত্রণ, বীজ বিস্তার, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই তারা অপরিহার্য। তাছাড়া দর্শনার্থীদের ভিড়ে স্থানীয় পর্যটনেও নতুন মাত্রা যোগ হয়, যা হাওরাঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

প্রকৃতিবিদদের মতে, অতিথি পাখি রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে তাদের সংখ্যা আরও কমে যাবে। তাই হাওর-বাঁওড়গুলোকে নিরাপদ রাখা, শিকার বিরোধী আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা এবং স্থানীয় জনগণকে সচেতন করা জরুরি।

প্রতিবছরের মতো এবারও অতিথি পাখির আগমনে শীতের সকালগুলো হয়ে উঠেছে কোলাহলমুখর, রঙিন এবং প্রাণবন্ত। পাখিদের ভরসার জায়গা হিসেবে বাংলাদেশ যেন দীর্ঘদিন তাদের প্রাকৃতিক আশ্রয় হয়ে থাকে—এটাই এখন সবার প্রত্যাশা।

সর্বশেষ