সর্বশেষ
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের সিল ও স্বাক্ষর জাল করে অবৈধ জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরির অভিযোগে গ্রেফতারকৃত মওদুদ আহমেদ শাওনকে (৩৫) তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। আদালত পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
সোমবার দুপুরে শাওনকে আদালতে হাজির করে পুলিশ সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করলে শুনানি শেষে বিচারক তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মোহনগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক জয় পাল বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আগামী ১ জানুয়ারি শাওনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মোহনগঞ্জ থানায় আনা হবে।
এর আগে গত বুধবার দুপুরে মোহনগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চত্বরের ভেতরে অবস্থিত তার নিজস্ব অনলাইন সেবার প্রতিষ্ঠান ‘এম.এফ আইটি সলিউশন’ থেকে কথিত রোহিঙ্গাদের ভুয়া জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরির অভিযোগে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। পরদিন সংশ্লিষ্ট ৭ নম্বর গাগলাজুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মো. রাজীব মিয়া বাদী হয়ে মামলা দায়ের করলে শাওনকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
গ্রেফতারকৃত মওদুদ আহমেদ শাওন মোহনগঞ্জ পৌর শহরের টেংগাপাড়া এলাকার কলেজ রোডের বাসিন্দা ফেরদৌস আহমেদের ছেলে। তার স্ত্রী ঝর্ণা আক্তার গাগলাজুর ইউনিয়নের একজন ডিজিটাল উদ্যোক্তা। অভিযোগ রয়েছে, স্ত্রীর নামে বরাদ্দকৃত অনলাইন কার্যক্রমের দায়িত্ব বাস্তবে শাওনই পরিচালনা করতেন। ঝর্ণা আক্তারের আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে তিনি নিয়মিত সরকারি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় পাঁচ থেকে সাত বছর আগে শাওন মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে টেকনিশিয়ান পদে চাকরির জন্য আবেদন করেছিলেন। বিধি মোতাবেক তিনি সরকারি কর্মচারী না হলেও রহস্যজনকভাবে ওই সময় থেকেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে পড়েন।
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় সরকারি ভাতা, অনুদান, টিসিবি কার্ড সংযোজন ও যাচাই-বাছাই, এমনকি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন সংক্রান্ত সরকারি ওয়েবসাইটের গুরুত্বপূর্ণ ও গোপন পাসওয়ার্ড পর্যন্ত তার নিয়ন্ত্রণে চলে আসে বলে অভিযোগ রয়েছে। একপর্যায়ে তিনি উপজেলার আটটি ইউনিয়নের জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনসহ বিভিন্ন অনলাইন কার্যক্রম কার্যত একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রণে নেন।
শাওনের চলাফেরা ও আচরণে অনেকেই তাকে ইউএনও কার্যালয়ের সরকারি কর্মচারী বলেই মনে করতেন। সরকারি দপ্তরের প্রভাব খাটিয়ে চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের সিল-মোহর ও স্বাক্ষর নকল করে অবৈধ জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরির মাধ্যমে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় ছিল বলে ধারণা স্থানীয়দের।
সচেতন মহলের প্রশ্ন ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর সচেতন মহলে ব্যাপক প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের প্রশ্ন—একজন সাধারণ অনলাইন ব্যবসায়ীর হাতে সরকারি ওয়েবসাইটের গোপন পাসওয়ার্ড কীভাবে গেল? শাওন যদি সরকারি কর্মচারী না হন, তবে কার প্রশ্রয়ে তিনি এত ক্ষমতার অধিকারী হলেন। তিনি কি কেবল একজন গুটি, নাকি পুরো চক্রের মূল হোতা।
সচেতন মহলের অনেকে আইনগত উদাহরণ টেনে বলেন,“লাইসেন্সধারী অস্ত্র দিয়ে অপরাধ সংঘটিত হলে যেমন দায় অস্ত্রের মালিকের ওপর বর্তায়, তেমনি ১৩ জন কথিত রোহিঙ্গার ভুয়া জন্মনিবন্ধনের দায় কার? এর নেপথ্যে কারা? এ অভিযোগের আঙুল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও অন্যান্য সংশ্লিষ্টদের দিকেও যাচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, শাওনের এই অবৈধ কার্যক্রমে তার দোকানে কর্মরত শ্যালক ও আরও একজন কর্মচারী সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করতেন। তবে তাদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপ না নেওয়ায় জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সচিবকে শোকজ নোটিশ প্রদান করেছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা খাতুন। তিন কর্মদিবসের মধ্যে জবাব দেওয়ার কথা থাকলেও এ বিষয়ে এখনো কোনো অগ্রগতি জানা যায়নি। একাধিকবার তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
মোহনগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হাফিজুল ইসলাম হারুন বলেন, শাওনকে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
★-থলের বিড়াল বের হবে কি?
রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ ও অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনার নেপথ্যে থাকা মূল কলাকুশলীদের নাম প্রকাশ পাবে এমনটাই আশা এলাকাবাসীর। তাদের দাবি, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
সর্বশেষ