ময়মনসিংহ
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ মো. ওসমান হাদির ওপর হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করে ভারতে পালিয়ে গেছে—এমন গুঞ্জনে সীমান্ত এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তবে এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্যে রয়েছে ভিন্নতা ও ধোঁয়াশা।
বিজিবি ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, হামলাকারীদের পালানোর বিষয়ে দুই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। একটি সূত্রের দাবি—হামলাকারীরা সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পালিয়ে গেছে। অপরদিকে আরেকটি সূত্র বলছে—তারা এখনো দেশ ছাড়তে সক্ষম হয়নি। এই পরস্পরবিরোধী তথ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ায় সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারিসহ টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
রোববার (১৪ ডিসেম্বর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
★—যাতায়াতের সম্ভাব্য রুট নিয়ে অনুসন্ধান।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, হামলাকারীরা ঢাকা মিরপুর এলাকা থেকে আশুলিয়া হয়ে একটি প্রাইভেটকারে ময়মনসিংহে আসে। পরে ময়মনসিংহ শহর থেকে আলাদা একটি প্রাইভেটকারে করে তারা হালুয়াঘাট উপজেলার ধারা বাজারে পৌঁছায়। সেখান থেকে মোটরসাইকেলে করে ভুটিয়াপাড়া সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তবে হালুয়াঘাট থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফেরদৌস এ ধরনের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি আনন্দ পত্রিকা জানান, “হামলাকারীরা সীমান্ত দিয়ে পালিয়েছে—এমন নিশ্চিত তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে গুঞ্জনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে যাচাই-বাছাই চলছে। সীমান্ত এলাকায় পুলিশের টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।”
★—বিজিবির বক্তব্য।
বিজিবি ময়মনসিংহ রিজিওনের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল সরকার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান আনন্দ পত্রিকাকে বলেন,“হামলাকারীরা পালিয়েছে কিংবা পালাতে পারেনি—এই দুই ধরনের তথ্য নিয়েই আমরা কাজ করছি। মানবপাচারের সম্ভাব্য সব রুটে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সন্দেহভাজনদের তল্লাশি এবং গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালানোর বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।”
অভিযান ও আটক: এদিকে, (১৩ ডিসেম্বর) রাতে ঢাকা থেকে আগত পুলিশের একটি বিশেষ টিম জেলা পুলিশের সহযোগিতায় হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া থানা এলাকা এবং পার্শ্ববর্তী শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী থানা এলাকায় অভিযান চালায়।
অভিযান চলাকালে হালুয়াঘাট থানা এলাকায় মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ফিলিপ স্নাল ও সঞ্জয় চিসিম নামের দুই ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে সঞ্জয় চিসিম, স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতা ও আরও দুইজনসহ মোট চারজনকে আটক করা হয়। তবে ফিলিপ স্নালকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে নালিতাবাড়ী এলাকায় অভিযান চালানো হলেও তাকে পাওয়া যায়নি বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।
জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য: পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, আটক সঞ্জয় চিসিমকে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি স্বীকার করেছেন যে ঘটনার দিন দিবাগত রাতে দুইজন বাংলাদেশি নাগরিককে ভারতে পাচারে সহায়তা করেছেন। পাচারকৃত ব্যক্তিদের বিস্তারিত পরিচয় ও যোগাযোগের তথ্য তার সহযোগীদের কাছে রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় আরও গভীর তদন্তের স্বার্থে আটক সঞ্জয় চিসিম (২৫) ও সিবিরন দিও (৩৬)-কে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
তদন্তের অগ্রগতি: হাদি ওপর হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানবপাচার, সীমান্ত নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার দিকগুলো গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত এগোচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, গুজব নয়—প্রমাণের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে হামলাকারীরা আদৌ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়েছে কি না—নাকি দেশের ভেতরেই আত্মগোপনে রয়েছে—সে প্রশ্নের উত্তর পেতে অপেক্ষা করতে হবে তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফলের।
সর্বশেষ