ময়মনসিংহ

কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বহাল অধ্যক্ষ, প্রশ্নবিদ্ধ শিক্ষা প্রশাসন

মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ, নিজস্ব প্রতিবেদক ময়মনসিংহ | ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:২২ অপরাহ্ন
news image
  • ক্ষমতার রাজনীতিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: কোটি টাকার দুর্নীতির পরও বহাল অধ্যক্ষ। ভুয়া বিল-ভাউচার, নিয়োগ বাণিজ্য এবং কলেজ ফান্ড থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া সত্ত্বেও নগরীর নাসিরাবাদ কলেজের অধ্যক্ষ আহমেদ শফিকের বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তদন্ত ও অডিট প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আট মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি বহাল তবিয়তেই দায়িত্ব পালন করছেন। এই নীরবতা এখন দুর্নীতির চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

  • অধ্যক্ষ আহমেদ শফিক স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ ময়মনসিংহ জেলা শাখার সভাপতি এবং মহানগর আওয়ামী লীগের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য। কলেজ সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ এই রাজনৈতিক পরিচয়ই তাকে বারবার রক্ষা করছে এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে কার্যত অচল করে রেখেছে।

  • তদন্তে প্রমাণ, তবু ব্যবস্থা নেই। ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার উম্মে সালমা তানজিয়ার নির্দেশে গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি এক মাসের অনুসন্ধানে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের সত্যতা পায়। প্রতিবেদনে উঠে আসে।

  • • ভুয়া বিল ও ভাউচারের মাধ্যমে নিয়মিত অর্থ উত্তোলন
  • • কলেজ ফান্ড থেকে আড়াই কোটি টাকা নগদ হাতে রাখা
  • • নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও সরাসরি বাণিজ্য
  • • রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে নিয়ম ও প্রশাসনিক বিধি উপেক্ষা

  • তদন্ত প্রতিবেদন জমা হলেও আজ পর্যন্ত তার কোনো প্রশাসনিক প্রতিফলন দেখা যায়নি। অডিটে ধরা পড়ে দীর্ঘ ১২ বছরের অনিয়ম পরবর্তীতে গঠিত অভ্যন্তরীণ অডিট কমিটি ২০১২-১৩ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত ১২ বছরের হিসাব নিরীক্ষা করে ধারাবাহিক আর্থিক অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে।

  • অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী।
  • • ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৬টি বিলে একক স্বাক্ষরে উত্তোলন: ৬,৩০,৮৮০ টাকা • ২০২০-২১ অর্থবছরে ১১টি বিলে উত্তোলন: ৬,৮৩,৮৬৩ টাকা • ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২৫টি বিলে উত্তোলন: ১১,৮১,৭৫১ টাকা।

  • প্রতিবেদনে বলা হয়, অধিকাংশ বিলেই ছিল ভুয়া ভাউচার ও নিয়মবহির্ভূত অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন। চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল অডিট প্রতিবেদন জমা দেওয়া হলেও কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। 

  • • নগদে কোটি টাকা, হিসাব শূন্য।
  • অডিট কমিটির পর্যবেক্ষণে আরও গুরুতর তথ্য উঠে আসে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে অধ্যক্ষ আহমেদ শফিক একাই ২ কোটি ২৬ লাখ টাকা নগদ হাতে রেখেছিলেন, যার কোনো ব্যয়ের হিসাব পাওয়া যায়নি।

  • তদন্ত কমিটির ছাত্র প্রতিনিধি ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা গকুল সূত্রধর মানিক বলেন,“এত বড় অঙ্কের অর্থের কোনো হিসাব না থাকা সত্ত্বেও অধ্যক্ষ বহাল থাকাটা শুধু অস্বাভাবিক নয়, এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতার নগ্ন উদাহরণ।

  • অডিট কমিটির প্রধান মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান আকন্দ বলেন, আমরা প্রমাণসহ বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। এরপর ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

  • নতুন কমিটি, পুরোনো নীরবতা।
  • চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি নির্বাচিত হন মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক শেখ আমজাদ আলী। তিনি অডিট প্রতিবেদন যাচাইয়ের জন্য তিন সদস্যের আরেকটি কমিটি গঠন করেন এবং তিন মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেন। তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও সেই কমিটি আজও প্রতিবেদন জমা দেয়নি।

  • অভিযোগ অস্বীকার করে অধ্যক্ষ আহমেদ শফিক দাবি করেন, তিনি কোনো তদন্ত প্রতিবেদন পাননি এবং অভিযোগগুলোর বিপরীতে লিখিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

  • তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, একাধিক তদন্ত ও অডিট রিপোর্ট জমা থাকার পরও ব্যবস্থা না নেওয়ার দায় কার?রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কি প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে নিষ্ক্রিয়? পাঁচ হাজার শিক্ষার্থীর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন অভিযোগের পরও একজন অধ্যক্ষ কীভাবে বহাল থাকেন?

  • নীরবতা কি দায়মুক্তির ইঙ্গিত?
  • ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত নাসিরাবাদ কলেজে বর্তমানে পাঁচ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ও প্রায় ১২০ জন শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির স্বার্থ যেখানে প্রশ্নের মুখে, সেখানে প্রশাসনিক নীরবতা এখন কেবল গাফিলতি নয়—এটি দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা দেওয়ার অভিযোগও উসকে দিচ্ছে।

  • প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও যদি ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে প্রশ্ন উঠছে এই দুর্নীতির দায় কি শুধু একজন অধ্যক্ষের, নাকি নীরব প্রশাসনেরও?

সর্বশেষ