সারাদেশ

প্রকল্পের টাকা নিয়ে প্রশ্ন, প্রশাসকের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক ময়মনসিংহ | ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১১:২৮ পূর্বাহ্ন
news image

ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরনিলক্ষীয়া ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক হাবিবুল্লাহকে ঘিরে একের পর এক দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, বরাদ্দ অর্থ ও খাদ্যশস্য ব্যবহারে স্বচ্ছতার অভাব, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বিতর্ক এবং অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, “ওয়ান পার্সেন্ট প্রকল্প”-এর আওতায় প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পে একটি ছাদসহ পাকা বাথরুম নির্মাণ, পুরোনো স্যানিটারি ল্যাট্রিনে হাই-কমোড স্থাপন এবং বারান্দায় লোহার গ্রিল বসানোর কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও মূল কাজ সম্পন্ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রকল্পের প্রথম কিস্তি হিসেবে ৮২ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার টাকা ভ্যাট ও অন্যান্য খাতে জমা দেওয়া হলেও অবশিষ্ট প্রায় ৪২ হাজার টাকার ব্যবহারে স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই অর্থ কোরবানির ঈদের আগে গরু কেনার কথা বলে নেওয়া হয়েছিল যা এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

এছাড়া সাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থ উত্তোলনের চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে। এ বিষয়ে ইউপি সচিব মো. আনিসুর রহমান বাধা দিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে জানা গেছে।

পরবর্তীতে দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ উত্তোলনের লক্ষ্যে আংশিক কিছু কাজ—যেমন লোহার গ্রিল স্থাপন ও হাই-কমোড বসানো—সম্পন্ন হলেও পূর্ণাঙ্গ পাকা বাথরুম এখনো নির্মিত হয়নি। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রকল্পে স্থানীয় ইউপি সদস্য জলিলকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও সেখানে অর্থ লেনদেনে অনিয়ম হয়েছে। অন্যদিকে, আরেকটি প্রকল্পে এক নারী সদস্যকে সভাপতি করে কাজ না করিয়েই ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও দেখা দিয়েছে দ্বন্দ্ব। জানা যায়, ৩ জুলাই ২০০৬ সালের আগে মৃত ব্যক্তিদের জন্য অনলাইন মৃত্যু সনদ বাধ্যতামূলক নয়। তবে প্রশাসক হাবিবুল্লাহ সচিবকে এ ধরনের সনদ গ্রহণে চাপ প্রয়োগ করলে তিনি তা নিয়মবহির্ভূত উল্লেখ করে অস্বীকৃতি জানান। এ ঘটনায় প্রশাসক ও সচিবের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়।

এদিকে প্রশাসকের অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে ইউনিয়ন পরিষদের স্বাভাবিক সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। জন্মনিবন্ধন, নাগরিক সনদ ও প্রত্যয়নপত্রসহ বিভিন্ন জরুরি সেবার জন্য ইউনিয়নবাসীকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসক হাবিবুল্লাহ বলেন, “আমি নতুন করে বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে ট্যাগ অফিসারের দায়িত্বে রয়েছি। ফিলিং স্টেশনের হিসাব-নিকাশ ও তদারকির কাজে ব্যস্ত থাকায় সবসময় ইউনিয়ন পরিষদে উপস্থিত থাকা সম্ভব হয় না।

তবে স্থানীয় বাসিন্দা আরিফুর রেহমানের দাবি, ইউনিয়ন পরিষদ সাধারণ মানুষের সবচেয়ে নিকটস্থ সেবাকেন্দ্র। সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক অনুপস্থিতি জনভোগান্তি বাড়াচ্ছে এবং সেবার মান ব্যাহত করছে।

উল্লেখ্য, প্রশাসক হাবিবুল্লাহর বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। গত ১৫ মার্চ অতিদরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ চাল আত্মসাতের অভিযোগ এবং ২৬ ফেব্রুয়ারি কাবিখা প্রকল্পে অনিয়মের বিষয়েও সংবাদ প্রকাশিত হয়।

অন্যদিকে, ইউপি সচিব মো. আনিসুর রহমান অভিযোগ করেছেন, প্রশাসকের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের পর তাকে লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তিনি এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, “উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার সম্মানহানি করার জন্য এ ধরনের অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। প্রকাশিত অভিযোগগুলোর পেছনে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও প্রতিহিংসা কাজ করছে।

ময়মনসিংহ বিভাগীয় সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক পলাশ বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশিত হলে তা গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করা জরুরি। অন্যথায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় এবং সংবাদকর্মীরা চাপের মুখে পড়েন।

সুশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগগুলোর প্রেক্ষিতে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা কমে যেতে পারে।

সচেতন মহল মনে করছে, প্রশাসনের নীরবতা এবং পাল্টা অপপ্রচারের ঘটনা একটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এতে সত্য উদঘাটনের পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতিবিরোধী লড়াই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

আবদুল হাকিমের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। অন্যথায় মাঠপর্যায়ের উন্নয়ন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সর্বশেষ